Cookie Policy          New Registration / Members Sign In
PrabashiPost.Com PrabashiPost.Com

হর-পার্বতী সংলাপ

হেমন্তের এক পড়ন্ত বেলায় কৈলাসে শিব-পার্বতীর এই কথোপকথন শুনলেন দিলীপ দাস।

Dilip Das
Tue, Oct 21 2014

Drawing: Dipanita Das

About Dilip

A public health physician in New Zealand, Dilip Das hails from a village in West Bengal’s Burdwan district. His literary interests include writing ‘belles-lettres’ (রম্য-রচনা) and short stories. He is the Joint Editor of Ankur. Please click here for the latest issue of ‘Ankur’


More in Culture

Happy Colours of Life

Durga Puja in London: The UnMissables

Mahishasura Mardini

একা বোকা

 
অল্প ক’দিন হ’ল ছেলেমেয়েদের নিয়ে পার্বতীর বাৎসরিক বাপের বাড়ি পরিভ্রমণ সাঙ্গ হয়েছে। প্রাচীনকালের মহিষাসু্রবধের স্মরণে ভক্তদের কাছ থেকে পূজো-অর্চনা যা পাওয়ার তা পাওয়া হয়ে গেছে। ভক্তরা আপাতত বছরখানেক চুপচাপ থাকবে। তারপর তাদের ভাষায় ‘আসছে বছর আবার হবে’। এখন পার্বতীর হাতে তেমন কোন কাজ নেই। ছেলেমেয়েরা বড় হয়েছে, তাদের নিজের নিজের কাজ আছে। বেশিরভাগ সময়ই তারা আর কৈলাসে থাকে না। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর – এঁদের প্রত্যেকেরই এখন মোবাইল ফোন হয়েছে। তার সুবাদে শলা-পরামর্শ করার জন্য ব্রহ্মার আমন্ত্রণে হরিহরকে আর ঘনঘন ব্রহ্মলোকে যেতে হয় না। অনেক আলোচনা, শলা-পরামর্শ ফোনে ফোনেই হয়ে যায়। তাই শিবের হাতেও এখন অনেকটা সময়। এই রকম অবসরে হেমন্তের এক পড়ন্ত বেলায় কৈলাসে হরগৌরী নিবাসের উঠোনে রোদে পিঠ দিয়ে বাঘছালের উপর বসে শিব পার্বতীর সাথে লুডো খেলছেন। বাহন নন্দী একটু দূরে বসে জাবর কাটছে।

 হেমন্তের এক পড়ন্ত বেলায় কৈলাসে হরগৌরী নিবাসের উঠোনে শিব পার্বতীর সাথে লুডো খেলছেন

(অঙ্কনে – মণিদীপা দাস)

ছেলেমেয়েরা কেউই বাড়িতে নেই। বিজয়া দশমীর পরদিনই গণেশ চলে গেছেন। তিনি এখন বেশিরভাগ সময় মুম্বইয়ে থাকেন। সেখানকার ধনী ব্যবসায়ীরা তাঁকে খুব খাতির-যত্ন করে যাতে তাদের ব্যবসার ‘গণেশ না ওল্টায়’ আর ‘জাদা মুনাফা’ হয়। মহারাষ্ট্রের গণেশ-চতুর্থী উৎসবের জাঁকজমক দেখলেই খাতির-যত্নের পরিমাণটা বোঝা যায়।

লক্ষ্মী এখন বেশিরভাগ সময় বিলেতে থাকেন – মাঝে মাঝে দেশে আসেন। বিলেতের ভারতীয় বংশোদ্ভূত বড় বড় শিল্পপতি আর ব্যবসায়ীরা তাঁকে ওখানে নিয়ে গেছে আর বলেছে, “লছ্‌মী মাইজী, আপনি এখানেই পাকাপাকিভাবে থাকুন। আমাদের ব্যবসা এখন ভাল যাচ্ছে না। সাহেবদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঝোঁকের মাথায় কতকগুলো বড় বড় কোম্পানি বেশি দাম দিয়ে কিনে এখন এই মন্দার বাজারে আর চালাতে পারছি না। বহুৎ লোকসান হচ্ছে। সারা বছর আপনার কৃপাদৃষ্টি পেলে আমাদের শিল্প এবং ব্যবসার অনেকটা সুরাহা হবে।” লক্ষ্মী পাকাপাকিভাবে বিলেতে থাকতে রাজি হননি। এখনও বাংলার কুলবধূদের ‘এসো মা লক্ষ্মী, বসো মা ঘরে’ ডাক তাঁকে আকুল করে। তাছাড়া কোজাগরী, পৌষ-সংক্রান্তি, আশ্বিন মাসে মা, বোন আর ভাইদের সাথে দাদু-দিদিমার বাড়ী যাওয়া – এসবও তো আছে। তাছাড়া পাকাপাকিভাবে ভারত ছেড়ে গেলে দেশটা ‘লক্ষ্মীছাড়া’ হয়ে যাবে যে।

কার্ত্তিকের ব্যাপারটা একটু অন্যরকম। বছর কয়েক আগে তিনি বেজিং গিয়েছিলেন অলিম্পিকের খেলা দেখতে। সেখানে সাঁতার আর জিমনাস্টিক্সের আঁটোসাঁটো আর খাটো পোষাকপরা কয়েকটি চীনা তরুণীকে তাঁর খুব পছন্দ হয়েছিল। বাংলার কুমারীরা তো কেউ তাঁকে পাত্তা দেয় না – তাঁর পূজো করে না। শুধু নিঃসন্তান দম্পতিরা হয় স্বেচ্ছায়, নয় বন্ধু-বান্ধবের পাল্লায় পড়ে, সন্তান আকাঙ্খায় তাঁর একটু পূজো-আচ্চা করে। তাই তাঁর আইবুড়ো নাম আজও ঘুচল না। যাইহোক, অলিম্পিক দেখে ফেরার পরই তিনি পরম উৎসাহে কাঠি (চপস্টিক) দিয়ে খাওয়া অভ্যাস করতে শুরু করেছেন। এখন তিনি চীনা ভাষা শেখার জন্য সাংহাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্ত্তি হয়েছেন। মনে বড় আশা, যদি সেখানে কোন চৈনিক সুন্দরীকে পাকড়াও করতে পারেন।

সাংহাই যাবার আগে তিনি তাঁর বাহন ময়ূরটিকে সরস্বতীর কাছে রেখে গেছেন। চীনদেশে এখন যত্রতত্র পাখিদের একটা বেয়াড়া ব্যারাম হচ্ছে। বিদেশে নিয়ে গিয়ে বাহনটিকে তিনি হারাতে চান না। সরস্বতীর রাজহাঁসটির সাথে ময়ূরটির বেশ ভাব হয়েছে। দুটিতে ভালোই আছে।

সরস্বতীই যা কৈলাসের কাছাকাছি থাকেন। মাইক্রোসফ্‌টের বিল গেটস্‌ মানসসরোবরের তীরে সরস্বতীর জন্য উচ্চ তথ্যপ্রযুক্তিসম্পন্ন সুরম্য এক অট্টালিকা বানিয়ে দিয়েছে। আর যখনই নতুন কোন তথ্যপ্রযুক্তি আবিষ্কৃত হচ্ছে, বিল সাহেব তখনই তার নবতম সংস্করণটি অট্টালিকায় বসিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। সেখানে বসে সরস্বতী কম্পিউটার আর ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিশ্বের শিক্ষায়তনগুলিতে কি ধরণের বিদ্যাচর্চা হচ্ছে তার খোঁজ-খবর রাখেন এবং প্রয়োজনমত পরামর্শ দেন। ভারতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির কাজকর্মে তাঁর বিরক্তি ধরে গেছে। তাদের বেশীর ভাগেই এখন বিদ্যাচর্চার থেকে রাজনীতিচর্চা বেশী হয়। সরস্বতীর আনুকুল্য লাভ করে বিদেশী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি হচ্ছে।

সরস্বতী মাঝে মাঝে বাবা-মায়ের সাথে দেখা করতে গেলে ল্যাপ্‌টপ্‌টি সঙ্গে নিয়ে যান এবং তাঁদের কম্পিউটারের ব্যবহার শেখান। অবসর সময়ে তিনি কি-বোর্ড বাজান আর নতুন নতুন রাগ-রাগিনী সৃষ্টি করেন। জাপানের সোনি কোম্পানি তাদের সর্বাধুনিক কি-বোর্ডটি তাঁকে উপহার দিয়েছে। দেখতে মোটেই বীণাযন্ত্রের মত না হলেও, বীণার নিখাদ সব সুর তাতে বাজানো যায়। আর শুধু কি তাই? ঐ একটি যন্ত্রকে বোতাম টিপে ইচ্ছামত কখনও বা সেতার, কখনও বা সরোদ, ইত্যাদি নানা বাদ্যযন্ত্রে পরিণত করা যায়। এক যন্ত্রে কত গুণ, কত সুর! সরস্বতীর খুব পছন্দ হয়েছে যন্ত্রটি।

সরস্বতী নিয়ম করে প্রতিদিন নিজের রাজহাঁস আর কার্ত্তিকের ময়ূরটিকে সঙ্গে নিয়ে মানসসরোবরের পাড় বরাবর প্রাতঃভ্রমণে যান। রাজহাঁসটি সরোবরের জলে নেমে সাঁতার কাটে, আর ময়ূরটি কখনও লাফাতে লাফাতে, কখনও বা একটু উড়ে তাঁর পিছন পিছন যায়। তবে বর্তমানে তাঁকে একটু সতর্ক হতে হয়েছে। পাখিদুটিকে আগলে আগলে রাখতে হয়, যাতে পরিযায়ী পাখিদের সংস্পর্শে এসে সে দুটি আবার কোন উৎকট ব্যারাম না বাধিয়ে বসে। চারিদিকে যা বার্ড-ফ্লু হচ্ছে!

এই হল শিব-দুর্গার পুত্রকন্যাদের বর্তমান খবরাখবর।

 অবসর সময়ে সরস্বতী কি-বোর্ড বাজান আর নতুন নতুন রাগ-রাগিনী সৃষ্টি করেন।

(অঙ্কনে – দীপান্বিতা দাস)

অনেকক্ষণ খেলার পর শিবের দুবার ছক্কা পড়ল। তিনি বললেন, “পার্বতী, দু’ছক্কা তিন। আমার সব গুটি উঠে গেল। তোমাকে হারিয়ে দিলাম।” তারপর একটু আক্ষেপের সুরে বললেন, “খেলায় তো তোমাকে হারালাম, কিন্তু একটা জায়গায় আমি তোমার কাছে অনেক আগেই হেরে বসে আছি। ভারতে আমরা দু’জনেই প্রায় সমান সমান গুরুত্ব পাই। তোমাকে নিয়ে বাঙালিরা চারদিন কি মাতামাতিটাই না করে। বছরের অনেকটা সময় তারা অন্ধকারে ডুবে থাকলেও তোমার পূজোর ক’দিন কি রোশনাই, আলোর কি বাহার! বাহারি মণ্ডপে মণ্ডপে তোমার ভক্তদের কি ভিড়! তবে আমার ভক্তরাও কম যায় না। আমার মাথায় ঢালবে বলে কত দূর দূর থেকে তারা হেঁটে গঙ্গাজল বয়ে নিয়ে আসে। আর যখন তাদের ‘ভোলে বাবা পার করেগা’, ‘জটাধারী পার করেগা’, ‘ভোলে ব্যোম্‌তারক ব্যোম,’ ইত্যাদি ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে, তখন আমার মূলাধার থেকে সহস্রার – সব চক্রে চক্রে, দেহের প্রতিটি কোষে কোষে আনন্দের কি শিহরণ যে বয়ে যায় তা তোমাকে কি বলে বোঝাব? আর তারপর ভক্তরা যখন ‘হর হর মহাদেব, ওঁ নমঃ শিবায়ঃ’ বলে আমার মাথায় কলসী কলসী গঙ্গাজল ঢালে তখন আমার দেহ-প্রাণ-মন একেবারে জুড়িয়ে যায়।”

কিন্তু ভারত, নেপাল এইরকম গুটিকয়েক হিমালয়-সন্নিহিত দেশের বাইরে অন্য কোথাও আমি কোন পাত্তাই পেলাম না। এটা আমার একটা বড় দুঃখ। এই বিশ্বায়নের যুগে আমারও তো মাঝ মাঝে এদেশ-ওদেশ যেতে ইচ্ছা করে। কিন্তু ভক্তরা না নিয়ে গেলে অনাহূতভাবে যাওয়া তো ভাল দেখায় না। আর তোমার ব্যাপারটা দেখ। বিদেশে বাঙালী ভক্তরা তোমাকে আর ছেলেমেয়েদের বছর বছর উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে সেখানে পূজো করবে বলে। নিয়মরক্ষার জন্য আমার একটা ছবি তোমার মাথার পিছনের চালচিত্রে সেঁটে দেয় বটে, কিন্তু ওই পর্যন্ত। সেটা আবার সব সময় দেখাও যায় না। আর সব আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু তো তুমি। এজন্য তোমাকে আমার একটু হিংসেও হয়।

আবার কৃষ্ণের কথাই ধরো। এই তো সেদিন যশোদার কোলে পিঠে চড়ে বড় হল। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অর্জুনের রথের সারথি হওয়া ছাড়া তার অভিজ্ঞতাই বা কি? কতই বা বয়স হয়েছিল তার লীলা সম্বরণের সময়? কিন্তু অভয়চরণ নামে তার এক বড় ভক্ত একা বৃদ্ধবয়সে দেশ-বিদেশে বিস্তর ছোটাছুটি করে এমন কৃষ্ণনাম প্রচার করলে যে সাহেবরা দলে দলে টিকি রেখে, মাথা মুড়িয়ে, খোল-কর্ত্তাল বাজিয়ে নিজের নিজের দেশে জোর হরিনাম সংকীর্ত্তন শুরু করে দিলে, রাধাকৃষ্ণের বড় বড় মন্দির বানিয়ে ফেললে!”

শিবের মর্মবেদনার কথা শুনে পার্বতী বললেন, “বছর চল্লিশ-পঞ্চাশ আগে আমি যখন আমেরিকায় প্রথম যাতায়াত শুরু করি তখন সেখানে ‘হিপি’ নামে এক সম্প্রদায়ের আবির্ভাব হয়। তাদের মাথায় একরাশ লম্বা লম্বা রুক্ষ-শুষ্ক চুল, মুখভর্ত্তি দাড়ি, বেশভূষার দিকে নজর নেই – মলিন, রংচটা, স্থানে-অস্থানে ছেঁড়া-ফাটা। তারা অনেকেই নাকি প্রচণ্ড অধ্যাত্মবাদী, বিভিন্ন ভারতীয় গুরুর চেলা। তাদের মাধ্যমে বিদেশে তোমার প্রচারের একটা সুযোগ ছিল। কিন্তু দিনকাল এখন বদলে গেছে, হিপিদের সেই রমরমা এখন আর নেই। লোকে তাদের পরগাছা মনে করে। তাদের দিয়ে এখন খুব একটা সুবিধা হবে বলে মনে হয় না।

তবে অন্যভাবে বিদেশে তোমার প্রচারের একটা চেষ্টা আমি করতে পারি। গত দু’বছর ভক্তদের ডাকে আমি নিউজিল্যাণ্ডের ওয়েলিংটন শহরে গিয়েছি। গতবার সেখানে এক জনপ্রতিনিধি এসেছিল আমার পূজোর উদ্বোধন করতে। সেই সময় জটাধারী এবং গঞ্জিকাসেবী আর এক জনপ্রতিনিধির কথা শুনেছিলাম। তার অধ্যাত্ম-ভাবের কথা জানিনা। তবে আমার মনে হয়েছিল তোমার ভক্ত হবার অনেক গুণ তার মধ্যে আছে। পরের বার ওয়েলিংটন গেলে খোঁজ নিয়ে দেখব তার বা তার মত অন্য কারুর মাধ্যমে তোমার জন্য কিছু করা যায় কিনা।”

শিব বললেন, “তাই দেখো।” তারপর বললেন, “আজ রাতের খাবারের জন্য ভাত, সোনামুগের ডাল, বেগুনভাজা, বড়িপোস্ত, আর ফুলকপি, মটরশুঁটি, টম্যাটো, গাজর ও আলু দিয়ে মাখামাখা করে একটা তরকারি রান্না কর। তবে শেষপাতে চাটনি আর তোমার বাপের বাড়ী থেকে আনা ‘হরপ্রিয়’ সন্দেশটা আর খাব না। ইদানিং আমার পিত্ত ঈষৎ কূপিত হয়ে আছে। আর কয়েকদিন আগে দেববৈদ্য অশ্বিনীকুমারকে দিয়ে রক্তটা পরীক্ষা করিয়েছিলাম। সে বলল, শোণিত-শর্করা-বৃদ্ধির একটু প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। আহারে সংযম আনতে হবে।’ যাইহোক, তুমি রান্না চাপাও। আমি এই অবসরে সন্ধ্যাহ্নিক আর প্রাণায়ামটা সেরে নিই।”

Please Sign in or Create a free account to join the discussion

bullet Comments:

 
Gautam Sarkar (Thursday, Apr 2 2015):
Nice!
 

 

  Popular this month

 

  More from Dilip

PrabashiPost Classifieds



advertisement


advertisement


advertisement