Cookie Policy          New Registration / Members Sign In
PrabashiPost.Com PrabashiPost.Com

ভালো থেকো ইউক্রেন

ভারতের বাইরে ইউক্রেনই আমার সবচেয়ে প্রিয় দেশ অথচ নানা কারণে এখন সেখানে জ্বলছে অশান্তির আগুন ।

Paramita Chakraborty
Tue, Jul 8 2014

About Paramita

রানাঘাটে বড় হওয়া আর তারপর বিবাহসূত্রে ইউক্রেনে যাওয়া । এখন দুবাইয়ের বাসিন্দা পারমিতার পছন্দ দুই ছেলের সাথে তাল মিলিয়ে ঘুরে-বেড়ানো এবং নতুন লোকেদের সাথে পরিচিত হওয়া ।


More in Views

An Enigmatic Beauty

লিস্টিকেল

বরিশালের বাঙাল

My many Kolkata

 
তুষের আগুনের মতো ধিকি ধিকি জ্বলছে ইউক্রেন । অনেক জায়গাতেই হয়ত এই আগুন বাইরে থেকে দেখা যায়না । কিন্তু কোথাও যেন একটা অবিশ্বাস দেশটাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে । অথচ প্রায় দুই দশক আগে যখন প্রথমবারের মতো পূর্ব ইউরোপের এই দেশটিতে পাড়ি দিয়েছিলাম তখন আর যাই হোক বিশ্বাস বা আস্থার কোনো অভাব অনুভব করিনি ।

প্রায় দু’বছর হল আমরা দুবাইতে আছি । কিন্তু আমাদের অস্তিত্বের সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে ইউক্রেন । তাই যে অশান্তির আগুন এই আপাত নিরীহ দেশটিকে ক্রমশ গিলে খাচ্ছে তা দেখে ভাবনা হয় । আশঙ্কার ভিড়ে উঁকি দেয় সেইসব মুখ যারা একসময় আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সাথে জুড়ে ছিলেন ।

কলকাতার উপকন্ঠে রানাঘাটে আমার বড় হওয়া । বিশ্বটাকে দেখার একটা সুপ্ত বাসনা হয়ত ছিল, আর পাঁচজনের যেমন থাকে আর কি ! কিন্তু সেই স্বপ্ন যে একদিন ইউক্রেনের হাতছানি হয়ে বাস্তব হবে তা স্বপ্নেও ভাবিনি ।

আমার বর, শুভ্র চাকরিসূত্রে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে ছিলেন। তাই বিয়ের পরে আমাকেও কিয়েভ পাড়ি দিতে হলো । দিল্লি থেকে প্রথম কিয়েভ-যাত্রার স্মৃতি আজও আমার স্মৃতিতে অমলিন ।

চেন্নাইয়ের মিঃ বালাজী আর তাঁর ইউক্রেনিয়ো স্ত্রী ওলিয়া দিল্লির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আমার সঙ্গী । আমার প্রথম বিদেশ যাত্রা, তাই বালাজী দম্পতির সাহায্য নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। আর তা ক্রমশ বন্ধুত্বে পরিণত হয় । সেদিক থেকে দেখতে গেলে ওলিয়াই আমার প্রথম বন্ধু যিনি ভারতীয় নন ।

দুজনের কেউই যেহেতু পরস্পরের ভাষা জানতাম না, তাই আমাদের আশ্রয় ছিল ইংলিশ-টু-রাশিয়ান অভিধান। আমার কিছু জিজ্ঞাস্য থাকলে আমি অভিধানে কাছাকাছি ইংরেজি শব্দটা ওলিয়াকে দেখাতাম । আবার ও আমার প্রশ্নটা অনুমান করে ঐ অভিধানে একটি রুশ শব্দের দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করত । এভাবেই প্রথম প্রথম আমাদের আড্ডা চলত ।

পরে ভাষাটা শিখতে শুরু করায় আমাদের আড্ডার পরিসরটা দীর্ঘায়িত হল সেই সঙ্গে পরিচয়ের পরিধিটাও কয়েক গুণ বেড়ে গেল । স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে মেলামেশা করা, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে একত্রিত হওয়া – এভাবেই মনের আদান প্রদান ক্রমশ বাড়তে বাড়তে গড়ে উঠল এক হৃদয়ের সম্পর্ক ।

আমাদের দুই ছেলে – টুকাই আর ডোডো – দুজনেরই জন্ম ইউক্রেনে । মাতৃভূমি বলতে যা বোঝায়, ওদের জন্য তা ইউক্রেন তথা কিয়েভের মাটি । ভারতের বাইরে যে শহরটা আমার প্রথম মনে আসে – যেখানে আমি সবচেয়ে নিরাপদ বোধ করি তা হল কিয়েভ ।

প্রথম যেদিন কিয়েভের মাটিতে পা দিয়েছিলাম সেদিন ওখানকার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছিলাম। সুন্দর সাজানো গোছানো, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর একটা জায়গা। বড় শান্তির জায়গা ছিল আমার প্রিয় কিয়েভ তথা ইউক্রেন। কখন, কিভাবে যে তাতে ফাটল ধরতে শুরু করলো তা বোধহয় অজানাই থেকে যাবে । অথচ এই অবিশ্বাসই সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ল সন্দেহের বাতাবরণ হয়ে । আর কার কী হল জানি না, কিন্তু পশ্চিমাপন্থী বনাম রুশপন্থীদের এই লড়াইয়ের শিকার হলেন ইউক্রেনের সাদাসিধে সাধারণ মানুষজন ।

প্রায় ২৩ বছর আগে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে ইউক্রেন তৈরী হওয়ার সময় লুদা, লুবা, নীনাদের মতো আমাদের পরিচিত অনেকেই নানাভাবে ক্ষতিগ্রন্ত হয়েছিলেন । তবুও তারা তা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন এই আশায় যে তাদের সন্তানেরা হয়ত স্বাধীন ইউক্রেনে শান্তিতে বসবাস করবে ! কিন্তু সেই শান্তি হয়ত অধরাই থেকে গেলো ।

হিংসার দাবানল কিয়েভেই জ্বলে উঠে আস্তে আস্তে তা ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে । ক্রাইমিয়া থেকে শুরু করে পূর্ব ইউক্রেনের নানা শহর বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে চলেছে । জুন-জুলাই-আগস্ট, এই তিন মাস ইউক্রেনের প্রাকৃতিক আবহাওয়া বড় মনোরম । রুক্ষ শীতের পর গ্রীস্মের এই মাসগুলোতে ইউক্রেনের মাটি ফুলে-ফালে ভরে ওঠে । সাধারণ লোকজন তখন কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে গা-গরম করতে ছোটেন সমুদ্রের তীরে । আমরাও এর ব্যতিক্রম হতে পারিনি ।

আর সমুদ্র মানেই ক্রাইমিয়া । পাহাড় আর সমুদ্রের অদ্ভুত এক সংমিশ্রনে, খুবই মনোরম প্রাকৃতিক সন্দৌর্যে ভরা এই ক্রাইমিয়া । ক্রাইমিয়ার যে শহরটাতে গিয়ে আমরা থাকতাম তার নাম ‘এবপাতোরিয়া’ । কিয়েভ থেকে সারারাতের ট্রেনযাত্রা করে পৌছতাম ঐ শহরে । তারপর সেখান থেকে গাড়িতে করে আরো ঘন্টা-দুয়েক গিয়ে ‘স্টর্মাভয়’ বলে একটা ছোট্ট গ্রামের বাড়িতে গিয়ে আমরা থাকতাম ।

একদম সমুদ্রের গায়ে এই গ্রামে থাকাকালীন স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে আমরাও পুরোপুরি ইউক্রেনিয়ান হয়ে যেতাম । যাঁদের বাড়ি গিয়ে থাকতাম সেই বাবা রায়া আর তাঁর মেয়ে লুদার কথা খুব মনে পড়ছে ।

প্রতিদিন সকালে উঠে মনে হয় আজ হয়ত দেখব ইউক্রেনের সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে । কিন্তু তা হয়ত হওয়ার নয় । একটার পর একটা ঘটনা ঘটেই চলেছে । আমার আশঙ্কা, মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের বিমান ধ্বংস হয়ে যাওয়া পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলবে ।

এখন খবরের কাগজে যে জায়গাগলোর নাম বেশি দেখি, যেমন পূর্ব ইউক্রেনের দানেস্ক, সেভেরদানেস্ক, লুগান্সক, স্লাভিয়ান্সক, মারিওপোল – এগুলো সবই শিল্প শহর এবং খনিজ পদার্থে সমৃদ্ধ । এককালে কাজের সূত্রে আমার বর শুভ্রকে প্রায়ই এইসব শহরে যেতে হত । আমিও বিভিন্ন সময়ে এ’সব জায়গায় গেছি ।

কিয়েভ থেকে সাড়ে সাতশো কিলোমিটার দূরে সেভেরদানেস্কে আমরা একবার ইউক্রেন-ভারত মৈত্রী সন্ধ্যা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলাম । সেখানে তৎকালীন ভারতীয় রাষ্ট্রদূত এবং শহরের মেয়র উপস্থিত ছিলেন । আমরা যে স্লাভিয়ান্সক্‌ হয়ে ওখানে গিয়েছিলাম সেই কয়লাখনি অঞ্চল এখন সবচেয়ে অস্থির জায়গাগুলোর অন্যতম ।

রুবেজনায়ার মতো এমন আরো অনেক শহরের সাথেই আমাদের কোম্পানির ঘণিষ্ট সম্পর্ক তৈরী হয়েছিল । সেই সব জায়গা আর পরিচিত লোকেদের মুখ বারবার মনে পড়ছে । শুধু চেনা নয় যাঁরা অচেনা তাঁদের জন্যও প্রতিনিয়ত প্রার্থনা করছি খুব তাড়াতাড়ি যাতে ইউক্রেনে শান্তি ফিরে আসে ।

প্রথম প্রথম যখন কাউকে বলতাম যে ইউক্রেনে থাকি, তখন অনেকেই মনে করতেন ইউ-কে বা ইউনাইটেড কিংডম । বারবার বুঝিয়ে বলতে হত ইউ-কে নয় ইউক্রেন । আজ সেই ইউক্রেন সংবাদ শিরোনামে । আমরাও তাই চেয়েছিলাম । যে ইউক্রেনের সাথে আমাদের জীবনের গভীর সম্পর্ক তৈরী হয়েছে সেই দেশটাকে সবাই চিনুক, জানুক ।

কিন্তু ঠিক এভাবে নয় !

প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এই দেশটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির দাবা খেলায় বৃহৎ শক্তিধরদের বোড়ে হিসেবে ব্যবহৃত হবে তা চাইনি কখনোই ।

Please Sign in or Create a free account to join the discussion

bullet Comments:

 
Kajari Guha (Tuesday, Aug 12 2014):
Loved the poignant expression of the turmoil her mind was in!Thanks for sharing and thanks to Probashipost too!
 
Dr. Sugata Sanyal (Monday, Jul 28 2014):
Paramita Chakraborty: You have brought out the agony of the people of this place, having been there, your details are also quite authentic. Your piece is great and thanks to Prabashi Post for publishing this wonderful article. We will expect your writing on some happier issues, soon. Congratulations.
 
Nirmalya Nag (Tuesday, Jul 22 2014):
Priya kono jaygar jakhon duhsamay ase, takhon moner bhetor je jantrana hoy, take sundar bhabe tule dhorechhen Paramita. Apnake dhanyabad, dhanyabad Prabashi Post-keo, apnar chokh diye amader Ukraine dekhanor janya.
 

 

  Popular this month

 

  More from Paramita


PrabashiPost Classifieds



advertisement


advertisement


advertisement