Cookie Policy          New Registration / Members Sign In
PrabashiPost.Com PrabashiPost.Com

শিয়রে ইবোলা

আফ্রিকার পরে এবারে ইউরোপেও ছড়িয়ে পড়েছে ইবোলা । কয়েক মাস ধরে সুদূর নাইজেরিয়াতে এই মারণ রোগের আতঙ্কের সাথে কিভাবে প্রায় ঘর করছেন, আবুজা থেকে তাই জানালেন শান্তনু দাস ।

Santanu Das
Fri, Oct 3 2014

 

About Santanu

An electrical engineer in the energy sector by profession, he has various creative interests, including cooking, photography, writing and web designing.


More in Views

An Enigmatic Beauty

লিস্টিকেল

বরিশালের বাঙাল

My many Kolkata

 



মৃত্যু ভয় কার নেই? আমারও আছে। আর আছে বলেই বিদেশ-বিভুঁইয়ে একটু বেশি মাত্রায় সাবধানতা অবলম্বন করে থাকি। বিশেষত নাইজেরিয়ার মতো জায়গায়। সেই অর্থে ২০১২ সালের নভেম্বর মাস থেকে এখনো পর্যন্ত ঘটনার ঘনঘটা নিজের চোখে দেখা হয়নি ঠিকই, তবে সংবাদপত্র থেকে পাওয়া এবং স্থানীয় সহকর্মীদের থেকে শোনা ঘটনা গায়ের রোম খাড়া করে দেওয়ার মতোই। হয়তো শুনতে যতটা ভয়ানক লাগে, আমার মনে হয় বাস্তবিক চিত্র কিন্তু ভারতের বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের কার্যকলাপের থেকে খুব আলাদা নয়। শুধু দেশটাকে জানিনা বলে, দেশবাসী আফ্রিকার অশ্বেতাঙ্গ মানুষ বলে এবং সর্বোপরি আফ্রিকা সম্বন্ধে একটা আজন্মলালিত ভীতি থেকেই এই দেশটার প্রতি বিরূপ মনোভাব হওয়াটা স্বাভাবিক।

দোষ-গুণ মিলে মানুষ, তেমনই ভালো-মন্দ মিশিয়ে একটা দেশ। কোনো দেশের সবকিছু ভালো আর কোনো দেশের সবকিছু খারাপ হতে পারে না। হয়তো রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাদের নিজস্ব আর্থিক লালসা চরিতার্থ করবার জন্য দেশের ভালো দিকগুলিকে বিকশিত হওয়ার সু্যোগ দেন না...যেটা তথাকথিত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির অন্যতম সমস্যা। এবং সেদিক থেকে নাইজেরিয়া হয়তো অগ্রগণ্য।

যাই হোক, ভালো কিম্বা মন্দ বিচার করার জন্য এই লেখার অবতারণা নয়। সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত ইবোলা সম্পর্কে কিছু অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করাই আমার কলম ধারণের প্রধান উদ্দেশ্য।

চিকিৎসাশাস্ত্রে ইবোলা সম্বন্ধে কি লেখা আছে, সে ব্যপারে আমার কিছুই জ্ঞান ছিলো না। কিছু কিছু খবর পাচ্ছিলাম লাইবেরিয়া, সিয়েরা-লিওন এইসব দেশ থেকে । আক্রান্ত এবং মৃতের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে সে খবরও কানে আসছিলো। দেশগুলি নাইজেরিয়া থেকে বেশি দূরে নয়, আশঙ্কা ছিলো কোনো সময় নাইজেরিয়াতেও ও সে মৃত্যুদূত হানা দিতে পারে। একটা চাপা আতঙ্ক মনে ছিলোই।

লাইবেরিয়ান মিঃ প্যাট্রিক স্যোয়ারের শরীরে ভর করে, নাইজেরিয়ার প্রাক্তন রাজধানী লাগোস-এ এই মারণ রোগের আবির্ভাব । এইসব খবর তো দাবানলের মতন ছড়িয়ে যায়। আমাদের কানে পৌঁছতেও বেশি সময় লাগেনি। আতঙ্ক আর আগুন দুটোই মারাত্মক...সর্বগ্রাসী। আমরা, বিশেষত যারা বিদেশি, তাদের অবস্থা তো বলার নয়। শ্যাম রাখি না কুল রাখি দশা। তৎক্ষণাৎ দেশে ফিরে যেতে চাইলে চাকরি যায়...থেকে গেলে প্রাণ যায় এই আশঙ্কা। সবারই একই দশা হয়েছিল কিনা জানিনা, কাউকে মুখ ফুটে কিছু না বললেও ভিতরে ভিতরে এই দোলাচল অন্তত আমার তো ছিলোই।

ধীরে ধীরে আরো আক্রান্তের খবর আসতে লাগলো। যত দিন যায় ততই যেন মৃত্যু বিভীষিকা স্বপনে, শয়নে, জাগরণে হানা দেয়। কলকাতায় বাড়িতে কোনকিছুই জানালাম না, যাতে তারা আতঙ্কিত হয়ে না পড়ে। নাইজেরিয়ার সরকার সাধ্যাতিরিক্ত চেষ্টা চালাচ্ছে, এই খবরে আশ্বস্ত হবার কোন কারণ খুঁজে পেলাম না। স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি সব বন্ধ হয়ে গেল সংক্রমণ এড়াতে। এর মধ্যে আমার এক ভারতীয় সহকর্মী তো বলেই ফেললেন যে তার বাড়ির লোক নাইজেরিয়াতে সংক্রমণের ব্যাপারে জেনে গেছে, তাই সে বাড়ি ফিরে যেতে চায়...কিন্তু সে আরো এক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে পারে। ইতিমধ্যে আমাদের আর এক পাকিস্তানি সহকর্মী ছুটি থেকে ফিরছে...তাও আবার লাগোস হয়ে। ভারতীয় সহকর্মীটি আবার তার সঙ্গেই প্রোজেক্ট সাইটে থাকে। গোদের উপর বিষফোঁড়া।

যাই হোক, মনের ভীতি মনেই চেপে রেখে কাজকর্ম করে যেতে থাকলাম। চারিদিক থেকে বিভিন্ন মেল, মেসেজ আসতে লাগলো...ইবোলা থেকে কি কি সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। কারোর সঙ্গে করমর্দন নয়, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সবসময় হাত ধোয়া তাও আবার সাবান দিয়ে, হ্যান্ড-স্যানিটাইজার ব্যাবহার করা...আরো কত কি! এরমধ্যে একদিন লাগলো ভীষণ সর্দি। হৃদপিন্ড তখন যেন গলার কাছে দলা পাকিয়ে একসার অবস্থা। পরে বুঝলাম যে কোনো একদিন আচমকা বৃষ্টিতে ভিজে গিয়ে আমার এহেন দশা হয়েছে।

আর এইসবের মাঝে যেটা সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হয়ে দাঁড়ালো, তা হলো গুজব। প্রথমত, লোকের কথায় মনে হত যেন ইবোলা নাইজেরিয়ার বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। আমি থাকি আবুজাতে। মনে স্বাভাবিক ভয় হলো যে আবুজাতে ইবোলা পৌছতে কতক্ষন। সরকারি বিজ্ঞপ্তি পড়ে জানা গেলো যে রাজ্য থেকে রাজ্যে ইবোলা ছড়িয়ে পড়ার খবর সত্য নয়। দ্বিতীয়তও, স্থানীয় লোকেদের মধ্যে ছড়িয়ে গেলো যে “বিটার কোলা নাট” ইবোলার প্রতিষেধক। “বিটার কোলা নাট”একধরণের বিশেষ বাদাম জাতীয় ফল, এখানকার লোকেরা পথ চলতে চলতে সেটা খেয়ে থাকেন। অনেক সময় তা দিয়ে তারা অতিথি আপ্যায়নও করেন। কিন্তু সেটাও যে গুজব, দু-একদিনের মধ্যে তাও স্পষ্ট হয়ে গেল। আসলে ডুবন্ত নৌকাযাত্রীর কাছে জলে ভেসে থাকা খড়কুটোও তো বেঁচে থাকার আশা...এটা আর এমনকি? তার উপরে হ্যান্ড স্যানিটাইজার বাজার থেকে উবে গেল...হুহু করে বিকোচ্ছিল তো। ৩৫০ নাইরার জিনিস কালোবাজারে ৩৫০০ নাইরা হয়ে গেলো (নাইরা এখানকার সরকারি মুদ্রা)। বিদেশিরা তাদের বউ-বাচ্চাকে নিজেদের দেশে ফেরত পাঠাতে মরিয়া । আমি এত আতঙ্কের মধ্যেও রাতে সুখনিদ্রা দিচ্ছিলাম। জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য, চিত্ত ভাবনাহীন...যা হওয়ার তা হবে! সেই যে এক ব্রিটিশ আমার কর্মজীবনের প্রথম দিকে শিখিয়ে ছিলেন, আগামীকাল সকালের সূর্যোদয় দেখতে পাবো কিনা তার নেই ঠিক, রাতের ঘুম মাটি করি কেনো ।

নাইজেরিয়াতে আসার পরে বেশ কিছু ভারতীয়ের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। তাদের সঙ্গে দেখা করলাম। তারাও ভীত কিন্তু ধৈর্যশীল। আমিও যেমন চঞ্চলতা প্রকাশ করিনি। শেষমেষ ভারতীয় দূতাবাসে যোগাযোগ করা হলো। তারা অভয় দিলেন। বললেন, ইবোলা এ’দেশে মহামারির আকার ধারণ করেনি আর এদেশের সরকারও সর্বতোভাবে ইবোলার প্রকোপ সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিছুটা আশ্বস্ত হলাম। মনটা একটু হালকা হলো। এর’মধ্যে আরো সুখবর আসলো যে “ন্যানোসিলভার”, ইবোলার অনুমোদনহীন অথচ পরীক্ষিত ওষুধ নাইজেরিয়াতে এসে গেছে। মনে হলো, নাই বা হলো অনুমোদনহীন, শিয়রে যখন মৃত্যু নাচছে, ওষুধ যখন এসে গেছে তখন আর ভয় কী? গ্যাঁটের কড়ি অনেক লাগবে...পিতৃদত্ত প্রাণটা তো বাঁচবে।

সর্বশেষ খবর অনুযায়ী ১৭ই সেপ্টেম্বর, ২০১৪ ‘র পরে নাইজেরিয়াতে আর কোন সংক্রমণের খবর পাওয়া যায় নি। সরকারি সূত্রের খবর ইবোলা আক্রান্তের সংখ্যা ১৯ যার মধ্যে সাতজনই মৃত। চারজঙ্কে এখনো আলাদা রাখা হয়েছে আর প্রায় সাড় তিনশো লোকের ওপর নজর রাখছেন চিকিৎসা কর্মীরা – অবশ্য সবই “রিভার্স স্টেট”এ। এর মধ্যেই আমি বিভিন্ন সইটে ঘুরে এসেছি...শঙ্কা আর সাবধানতা নিয়ে। প্রতি এয়ারপোর্টে ইনফ্রারেড গান এ নিজের শরীরের টেম্পারেচার টেষ্ট করিয়ে।

তবুও আতঙ্ক গেছে কি? আপাত শান্ত পরিবেশ দেখে মনে হয় সব ঠিকই আছে। অথচ নাইজেরিয়াতে ইবোলা নির্ণয় করার কোন হাসপাতাল বা ল্যাবরেটরি নেই। নেই কোনো ভালো সরঞ্জাম। দেশের সীমানা তেমন জোরদার নয়। পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে সংক্রমিত কেউ সীমানা পেরিয়ে কোন গ্রামে ঢুকে পড়লে কেই বা তাকে ঠেকাতে পারবেন...আর তারপরে? হতেই পারে আমরা ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির উপরে আছি। কোনদিন জেগে উঠবে...আর আরও একটা লাইবেরিয়া, গিনি কিম্বা সেনেগাল, কিম্বা সিয়েরা লিওন...কে জানে?

আছি, কাজ করে যাচ্ছি। ভুলেই থাকি। স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটি খুলে গেছে, অবশ্য দক্ষিন নাইজেরিয়ায় এখনো অনেক রাজ্যে তা বন্ধ। মাঝে মাঝে সহকর্মীরা তাদের মোবাইলে রেডিও অন করলে “ইবোলা” শব্দ শুনে তাদের জিজ্ঞাসা করি, কি খবর? তাদের আশ্বাসনে আবার কাজে মনোনিবেশ করি।

এ লেখা কোন তথ্যসম্বলিত লেখা নয়। তথ্যজালের দৌলতে যে কেউ নাইজেরিয়ার খবরাখবর পেতে পারে্ন, কিন্তু আমরা যারা এখানে পেটের ভাত রোজগারের জন্য পড়ে আছি, তাদের মনের খবর কেউ দিতে পারবে না। আমার এক সহকর্মীর স্ত্রীকে বলতে শুনেছি, “আমি মরে যেতে রাজি আছি, কিন্তু আমার মেয়েটার কোন ক্ষতি চোখের সামনে দেখতে পারবো না”। সহকর্মীটি বাধ্য হয়েই স্ত্রী-কন্যাকে ভারতে পাঠিয়ে দিয়েছে।

আমার যে সহকর্মী এক সপ্তাহ দেখবে বলেছিল, সে জুন মাসে বিয়ে করে কলেজ পাঠরতা স্ত্রীকে ভারতেই রেখে এসেছেন...তারও সে কথা বলার পরেও অনেক সপ্তাহ হয়ে গেল। এদেশ ছেড়ে চলে গেলে চাকরিও তো যাবে...খাবে টা কী? আমার বাড়িতে কিছু শুনেছে, কিছু বোঝার চেষ্টা করেছে...চেষ্টা করেছি বেশিরভাগটাই লঘু করে দেখাবার, আমি বিপন্মুক্ত জায়গায় রয়েছি ইত্যাদি বলে। তারা আমাকে নিয়ে চিন্তা করে না (বা হয়তো করলেও, আমাকে জানায় না)...মনে হয় শান্তিতেই ঘুমোয়। আমার ঘুমেও খুব একটা বিঘ্ন ঘটে না, কিন্তু ঘুমোতে যাওয়ার আগে খুব করে ঠাকুরকে ডাকি। মৃত্যু যদি তাড়াতাড়িই লেখা থাকে তা হবে, কিন্তু......

Please Sign in or Create a free account to join the discussion

bullet Comments:

 
Santanu Das (Wednesday, Oct 8 2014):
Thanks to Mr. Suddhasattwa Bandyopadhyay and Mr. Rajshekhar Banerjee for your inspiring and valuable comments.
 
Rajshekhar Banerjee (Wednesday, Oct 8 2014):
As Ebola is looming as a global threat, this article from Abuja in Nigeria is interesting and significant in many ways. Firstly, it highlights the experiences of Indians living and working in Africa. They are making vital contribution to the economies of the countries they live in and also to the export of expertise from India. The second is about the apathy of the Indian establishment towards them as compared to those in the West. Finally, it also underlines the plight of Africa.
 
Suddhasattwa Bandyopadhyay (Tuesday, Oct 7 2014):
Pretty powerful. Wish you the best Shantanu.
 

 

  Popular this month

 

  More from Santanu


PrabashiPost Classifieds



advertisement


advertisement


advertisement