Cookie Policy          New Registration / Members Sign In
PrabashiPost.Com PrabashiPost.Com

বরিশালের বাঙাল

তপন রায়চৌধুরীর রসিকতা-সিঞ্চিত পান্ডিত্যগুণ আমাদের সমৃদ্ধ করেছে, কিন্তু কখনোই ভারাক্রান্ত করেনি।

Tirthankar Bandyopadhyay
Sat, Nov 29 2014

About Tirthankar

Tirthankar has spent much of his professional life working for the BBC. He is the editor of Prabashi Post.


More in Views

An Enigmatic Beauty

লিস্টিকেল

My many Kolkata

শিয়রে ইবোলা

 
বছর ১৫ আগে লন্ডনে এসে এক অদ্ভুত নেশায় আমাকে পেয়ে বসেছিল। ছুটির দিনে বাড়িতে বসে ব্রিটেনের দূরভাষ সংযোগ প্রদানকারী সংস্থা ব্রিটিশ টেলিকম বা বিটি’র ডাইরেক্টরি থেকে ভারতীয় তথা বাঙালি নাম-ঠিকানা খুঁজে বের করতাম। কেনো করতাম তা এখন আর মনে নেই। হয়ত পরবাসে একা থাকার নিঃসঙ্গতা কাটিয়ে ওঠাই ছিলো এর পরোক্ষ লক্ষ্য। এমনই এক ছুটির ধূসর দুপুরে জনৈক অরুণ গাঙ্গুলিকে ফোন করে বসলাম। কলকাতা থেকে লন্ডনে পাড়ি দেওয়ার সময় আমার এক আত্মীয় একই নামের একজনের সন্ধান দিয়েছিলেন। টেলিফোন ডাইরেক্টরিতে পাওয়া অরুণ গাঙ্গুলি সেই ব্যক্তি, না তাঁর সমনামী তা যাচাই করে নেওয়াই ছিলো আচমকা ঐ দূরভাষ যোগযোগের কারণ।

তপন রায়চৌধুরীকে নিয়ে লিখতে বসে এই গৌরচন্দ্রিকার একটাই কারণ। অরুণ গাঙ্গুলির কাছেই আমি তপনবাবুর নাম প্রথম শুনি। বিবিসি বাংলা বিভাগে কাজ করি শুনেই অরুণবাবু প্রথম বলেছিলেন তপনবাবুর কথা। জন্মসূত্রে ভাবনীপুরের ঘটি অরুণবাবু এও বলেছিলেন, বরিশালের বাঙাল হলেও তপনবাবুর মেধা অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। বৃহষ্পতিবার সকালে তপনবাবুর প্রয়াণের খবর শোনার পর থেকে অরুণবাবুর কথাও খুব মনে পড়ছে। বছর কয়েক আগে তিনিও ইহলোক ত্যাগ করেছেন।

তপনবাবুকে আমি কোনোদিন চর্মচক্ষে দেখিনি। কিন্তু যেদিন থেকে তাঁর লেখা, বাক্‌-পটুতা, রসিকতার সংস্পর্ষে আসার সুযোগ হয়েছে সেদিন থেকেই তাঁর তীক্ষ্ণ মেধার বিচ্চুরণ অনুভব করেছি।

কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে সুশোভন সরকার-এর ছাত্র তপনবাবু তাঁর প্রথম ডক্টরেট করেন আরেক স্বনামধন্য যদুনাথ সরকারের তত্ত্বাবধানে। আকবর-জাহাঙ্গির-এর আমলে বাংলার অবস্থা নিয়ে যখন তিনি এই গবেষণা শেষ করেন তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৩। সে’ আমলে সামাজিক ইতিহাস লেখা দস্তুর ছিলো না কিন্তু তা করতে গিয়ে ফার্সি পর্যন্ত শিখেছিলেন তিনি। ডাচ্‌ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নিয়ে তাঁর দ্বিতীয় ডক্টরেটটি তিনি করেন অক্সফোর্ড-এর বালিওল কলেজে। উনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীর বাঙালি বিদ্বজ্জনের মননে ইউরোপ নিয়ে ধারণা-সমৃদ্ধ তাঁর পরবর্তী গবেষণা কাজ “ইউরোপ রিকন্সিডার্ড” গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশিত হয়। এ’সবই আমি জেনেছি অন্য লোকের লেখা পড়ে। ওঁর অমায়িক কথাবার্তায় নিজেকে জাহির করার কোনো চেষ্টা কখনোই চোখে পড়েনি।

বিবিসি বাংলার হয়ে বিভিন্ন বিষয়ে দূরভাষে যতবার তপনবাবুর সাক্ষাৎকার নিয়েছি, কোনোবারই তাঁকে জ্ঞান-তাপস নয় বরং সাধারণ মানুষের চালু ভাষায় কথা বলা একজন প্রাজ্ঞ অভিভাবক বলে মনে হয়েছে। যিনি তাঁর রসিকতা-সিঞ্চিত পান্ডিত্যগুণে আমাদের সমৃদ্ধ করেছেন, কিন্তু কখনোই ভারাক্রান্ত করেননি। ওঁর ইতিহাসবেত্তা সাহায্য করেছে অতীতের নিরীখে বর্তমানকে বিশ্লেষণ আর ভবিষ্যৎকে অনুমান করতে।

তপনবাবুর আত্মজীবনী ‘বাঙালনামা’ আমি পুরোটা পড়িনি। ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হওয়ার সময় যে কয়েক খন্ড পড়েছি তাতে মনে হয়েছে, এ’যেন লেখা নয় বরং গল্প বলার ঢং-এ পাঠকের সঙ্গে নিরন্তর কথা বলে চলেছেন লেখক। শব্দচিত্র রচনার মাধ্যমে তিনি শুধু নিজের অভিজ্ঞতার কথাই বলেননি বরং তার সাথে সমানতালে চলেছে সমকালীন ইতিহাসের পাতা ওল্টানো। এ’যেন পরীক্ষার আগের দিন গল্পের ছলে সন্তানকে প্রস্তুত করে চলেছেন পরম মমতাময়ী জননী। যাতে কোনো প্রাপ্তির প্রত্যাশা নেই, আছে শুধু ভাবীকালকে সাহিত্যগুণে ইতিহাস-সমৃদ্ধ করার নিরলস প্রয়াস।

একবার ছাড়া যতবার তপনবাবুর সাথে কথা বলেছি ততবারই মনে হয়েছে নিজের জ্ঞানের ভান্ডার অযাচিতভাবে উপুড় করে দেওয়া নয়, তাঁর লক্ষ্য ছেলে ভোলানোর গুণে ইতিহাসের অমোঘ কাহিনী নিজের পাঠকদের আত্মস্থ করতে সাহায্য করা। একমাত্র ইরাক যুদ্ধের সময় তপনবাবুকে একবার বিচলিত হতে দেখেছি, যখন তিনি তত্কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশকে “নরখাদক” বলতেও কুন্ঠিত হননি। সাংবাদিকের “অবজেক্টিভ” দৃষ্টভঙ্গি থেকে ওঁর এই উক্তি হয়ত গ্রহণযোগ্য নয়, কিন্তু এই শব্দ প্রয়োগের মধ্যে দিয়ে তিনি যে বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন তাকেও বা অস্বীকার করি কেমন করে!

শৈশবে ঠাকুমার কাছে শুনেছি, বরিশালের লোকেরা নাকি ভীষণ রগচটা আর একরোখা প্রকৃতির, তবে ভীষণ উদারমনা। তপনবাবু বরিশালে কীর্তিপাশার জমিদার পরিবারের উত্তরসূরী হলেও দূর থেকে ওঁকে কখনো রগচটা মনে হয়নি। তবে অনেকবারই ওঁর উদার মনের পরিচয় পেয়েছি। আমার পূর্বপুরুষের ভিটে বরিশালের সাথে তপনবাবুর আজন্ম যোগাযোগ অনেক বছর ধরেই আমার শ্লাঘার কারণ। ওঁর লেখা আর কথা বলার গুণে কবে যে তা আত্মিক বিস্তৃতি পেয়েছে তা এতদিন উপলব্ধি করিনি। আজ যেন সেই উপলব্ধিও নিঃসঙ্গ হলো।

Please Sign in or Create a free account to join the discussion

bullet Comments:

 

 

  Popular this month

 

  More from Tirthankar


PrabashiPost Classifieds



advertisement


advertisement


advertisement