Cookie Policy          New Registration / Members Sign In
PrabashiPost.Com PrabashiPost.Com

লিস্টিকেল

লোকে বলে ইন্টারনেটেই লিস্টিকেলের জন্ম যদিও তুলসীদাস থেকে আর্জেন্টিনিয় সাহিত্যিক বোর্হেস যে এর অনুরাগী ছিলেন তার প্রমাণ আছে।

Rajat Chaudhuri
Thu, Dec 4 2014

 

About Rajat

লেখক এবং সাহিত্য সমালোচক রজত ইতিমধ্যে তার দুটি ইংরেজি উপন্যাস, Hotel Calcutta এবং Amber Dusk, এবং বাংলা কল্পকাহিনী ক্যালকুলাস-এর জন্য পাঠকদের নজর কেড়েছেন।


More in Views

An Enigmatic Beauty

বরিশালের বাঙাল

My many Kolkata

শিয়রে ইবোলা

 
হুড়মুড় করে বলা চলবে না কিছুতেই। রসিয়ে রসিয়ে প্রাবন্ধিকের ছন্দে এগোনও মানা। বিষয় হোক যতই রোমহর্ষক, তাতে থাক না জড়িয়ে ভয়, ঘেন্না, প্রেম, ঈর্ষা, রুদ্ধশ্বাস নাটক অথবা শুধুই তথ্যের আতিশয্য। হোক না তা নাৎসিদের নরককুণ্ডে মানুষের শরীরে টিটেনাস জীবাণু ঢুকিয়ে দেওয়ার বর্বরোচিত পরীক্ষা অথবা দুনিয়ার সেরা প্রেম করার জায়গাগুলির বর্ণনা। রাজার হুকুম লিস্টিকেলের ক্রাচে করে লেংচে লেংচে এগোতে হবে। শব্দটা নতুন, সবে মাত্র অক্সফোর্ড ডিকশনারি ডট কম এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু রাজা প্রজা সকলেই লিস্টিকেল নিয়ে মেতে উঠেছে বেশ কিছুদিন হল।

লোকে বলে ইন্টারনেটেই লিস্টিকেলের জন্ম যদিও তুলসীদাস থেকে শুরু করে আর্জেন্টিনীয় সাহিত্যিক বোর্হেস যে এর অনুরাগী ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। পরিসংখ্যান হাতে না থাকলেও অনুমান করা যায় যে কেন্দ্রে সরকার বদলের পর কচ্ছ থেকে কাঁকিনাড়া সর্বত্র হনুমান চলীসার পপুলারিটি নিশ্চয় বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে লিস্টিকেলের যে ভারতব্যাপী সুনাম ছড়িয়েছে এই ঘটনাটি হয়ত মিডিয়া বিশেষজ্ঞদের শ্যেন দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। সেই জন্য তাদের দোষ দেওয়া যায় না। হনুমান চলিশাই যে দুনিয়ার প্রাচীনতম লিস্টিকেল সে খবর তো তাদের কাছে পৌঁছায়নি।

সে যাই হোক আর দেরি না করে বলে ফেলা ভাল যে লিস্ট (তালিকা) আর আর্টিকেল (প্রবন্ধ) এই দুইয়ে মিলে ইংরাজিতে লিস্টিকেল শব্দের উদ্ভব। বাংলায় অবশ্যই ওই দুটো শব্দকে ফেবিকল দিয়ে জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে তার ফল মোটেও ভাল হবে না বলেই আমাদের অনুমান। ‘অনেক তো লিস্টি লিস্টি করলেন এবার মালটা কি একটু ঝেড়ে কাশুন তো,’ একজন কানের পাশে চিৎকার করে বলে যায়। ঠিক বলেছেন ভদ্রলোক। আসলে ওনার মত ব্যাগ্র পাঠকের কারণেই লিস্টিকেলের জন্ম।

আজকের টালমাটাল টাইমসে যেখানে একদিকে মারণব্যাধির খোঁচা অন্যদিকে হিংসার অট্টহাসি আর তারই মধ্যে রোবট-চক্ষু বিস্ফারিত করে সেনসেক্সের লেটেস্ট আইটেম নাম্বার দেখে নেওয়ার অদম্য আগ্রহ, এসবের ফাঁকে গভীর সুচিন্তিত প্রবন্ধ পড়ার সময় কই। তাই তো হই হই করে এসে গেল ফেসবুকের পাতায় পাতায়, ইন্টারনেটের বগলের ভাঁজে, ব্লগারদের পোস্টে পোস্টে, লিস্টভার্স বা রেডিটের মত ওয়েবসাইটের পরতে পরতে, এই চটপটে, প্রবন্ধের ফাস্ট ফুড, পাঠকের পোয়াবারো- লিস্টিকেল।

দেখুন না লিস্টভার্স ওয়েবসাইটে উঁকি মেরে। পঞ্চবিংশতির বেতাল মার্কা স্টাইলে, বিক্রমাদিত্যকে না পেয়ে আপনার কাঁধের উপর ডাইভ দিয়ে পড়বে। - ‘টপ টেন ইয়ং কিলার্স’ অর্থাৎ কম বয়সি খুনেদের প্রথম দশ, অথবা ভাগ্য গণনার অদ্ভুত দশটি উপায়, কিম্বা প্রেম করার বাছাই দশটি শহর, নয়ত জীবন্ত মানুষকে নিয়ে ঘৃণ্যতম দশটি পরীক্ষা ইত্যাদি প্রবন্ধ। সবই এক কায়দায় লেখা- প্রথমে কয়েকটি বাক্যে মুখবন্ধ তারপর পটাকা প্লেলিস্টের স্টাইলে একটি একটি করে দশটি পয়েন্টে নাতিদীর্ঘ আলোচনা। ফেসবুকের মত সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইটগুলো তো লিস্টিকেলের লীলাক্ষেত্র, কখনও টপ টেন, কখনও সেরা ছয়, কোনটা আবার থীম অনুযায়ী সাজানো কোনটা এলোমেলো।

বলতেই মনে পড়ে গেল এক বন্ধুর কথা। বছর খানেক হল সে মোবাইল ফোন অফ করে আমাদের আড্ডার থেকে বিদায় নিয়েছে। ইমেলেও তাকে কেউ ধরতে পারে না আর বাড়ি গিয়ে বিরক্ত করার সাহস যোগায় না। সেদিন হঠাৎ দেখা হয়ে গেল সেন্ট্রাল ক্যালকাটা কফিহাউসে। কফি খেতে খেতে গল্পও হল খানিক, কিন্তু আমি তার উধাও হওয়ার রহস্যভেদ করার চেষ্টা না করে তার হাতের কাগজটা চেয়ে নিয়ে একটু নেড়েচেড়ে দেখছিলাম। আকর্ষণীয় হেডলাইনের কারণেই হয়ত বিলিতি কাগজের একটি লেখা প্রথমেই চোখে পড়ল এবং আমি গোগ্রাসে লেখাটিকে গিলতে শুরু করলাম। খানিক বাদে বন্ধু বিরক্ত হয়ে বলল ‘আমি তাহলে আজকে উঠলাম’। আমার তখনো পড়া শেষ হয়নি। কি বিষয় ছিল লেখাটির? সেকথা শেষের বেলায় হবে। সেদিন থেকেই লিস্টিকেল নিয়ে গবেষণা শুরু করি আর মাঝে মাঝে তুলসীদাসের দূরদর্শিতার কথা মনে করে হনুমান চলিশায় ফিরে যাওয়া-

“মহাবীর বিক্রম বজরঙ্গী


কুমতি নিবার সুমতিকে সঙ্গী...”



কিন্তু একটা হেভিওয়েট উদাহরণ তো দরকার। এক নিশ্বাসে এতগুলো কথা বলে গেলেও লিস্টিকেলের গল্পটা পরিষ্কার হয় না। তাই এই প্রবন্ধের বাকি অংশটা লিস্টিকেল আকারেই পরিবেশিত হল। এই লিস্টিকেলের নাম হতে পারে- ‘লিস্টিকেল সম্পর্কে এই পাঁচ-কথা না জেনে রাখা বেআইনি’।

সর্টকাট পণ্ডিতঃ এই যুগে মানুষের হাতে সময় যত কমেছে তথ্যের পর্বতগুলির উচ্চতা সমানতালে যেন বেড়েই চলেছে। কোন সাবজেক্ট নিয়ে এতটুকু যদি জানার ইচ্ছে হয়েছে অমনি উইকিপেডিয়া, গুগল, ডিগ, রেডিট আর কুইজ মাস্টারেরা মিলে টানতে টানতে জ্ঞান সাগরের এমন গভীরে নিয়ে যেতে চায় যে সেখান থেকে ফিরে আসা অরণ্যদেবেরও অসাধ্য। আবার কোন বিষয়ে বেশী কৌতুহল হলেই পড়তে হবে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধের ফাঁদে নয়ত লাইব্রেরীর অতলান্তিকে খাবি খেতে খেতে প্রাণ বিসর্জন দিতে হবে। এমতাবস্থায় ওই লিস্টিকেল হয়ে গেল খেটে খাওয়া ইন্টারনেট প্রেমী জনতার রক্ষা কবচ, সর্টকাট পন্ডিত হওয়ার একমাত্র রাস্তা। অশ্বত্থামা অথবা সাঁ জারম্যাঁর জীবনী না ঘেঁটেই জেনে নেওয়া যাচ্ছে অমর হওয়ার ছয়টি সহজ উপায়, আবার ব্রিজের আড্ডায় ঝটপট বলে ফেলা যাচ্ছে দশটি প্রাচীন কমিউনিস্ট সমাজব্যবস্থা সম্বন্ধে দুচার কথা। তারপর ইচ্ছা হলে সেই বিষয়ে আরো পড়াশুনা করা যেতে পারে কিন্তু ধরি মাছ না ছুঁই পানি পদ্ধতিতে জ্ঞানারোহণ করতে হলে এই ফর্দ মার্কা লিস্টিকেলের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া উপায় নেই।

ক্লিকবেট বা ক্লিক-টোপঃ বেট অর্থাৎ টোপ কিন্তু মাছ ধরার নয়। লিস্টিকেলের টোপ টোপা কুলের মত সোশ্যাল নেটওয়ার্কের ডালে ডালে লটকানো রয়েছে। নজরকাড়া সব হেডিং ফুরফুরে ডিজিটাল বাতাসে দোল খাচ্ছে। দেখলেই লোভ লাগে, কাঁচা আম বলে ভুল হয় আর ভুল হলেই মাউস ক্লিক। ব্যাস সটান চলে গেলেন ‘বাছাই করা পাঁচটি গলা কাটার নিয়ম’ জানতে। ক্লিকবেটের সঙ্গে লিস্টিকেলের বন্ধুত্ব ন্যাংটা বয়সের। একটি ছাড়া আরেকটি প্রায় অচল। তাই মিডিয়া ম্যানেজার থেকে শুরু করে পাঁচুরাম ব্লগার সবাই সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে এবং অন্যত্র ঝুলিয়ে রাখে ওই সব আকর্ষণীয় ক্লিক-টোপ যা দেখলেই জ্ঞান লালসায় জিভ লকলকিয়ে ওঠে।

দুসরা কোই নহিঁঃ সমুদ্র গুপ্তর আমলে মানুষ নিরহঙ্কার ছিল কিনা বলা যাবে না কিন্তু এ কথা ঠিক যে একালের ইন্টারনেট এবং বিশেষ করে সোশ্যাল নেটওয়ার্কগুলো হচ্ছে অত্যুক্তি আর বাহু আস্ফালনের অবাধ ক্ষেত্র। একটু আনমনা হলেই তুলোর ব্যাপারীদের মত তুলো উড়িয়ে  চোখে ধুলো দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার লোকের অভাব নেই। এখানে কে কতো ডেসিবেলে ঢেকুর তুলতে পারে তাই দিয়েই কেরামতির বিচার হয়। এমন মুক্তাঞ্চলে যে লিস্টিকেল তার রাজত্ব বিস্তার করে বসবে, এ তো ক্লাস ওয়ানের ছেলেও বুঝতে পারবে। প্রথম পাঁচ, টপ টেন, বাছাই ছয়, জানতেই হবে দশ, এ ধরনের শিরোনামের টুপি হাতে নির্ঘণ্ট স্পেশ্যালিষ্ট এই ফাস্ট ফুড প্রাবন্ধিকরা আপনার নয়নের মণি হওয়ার লক্ষ্যে অহর্নিশি পরিশ্রম করে চলেছে।

ধর তক্তা মার পেরেকঃ হ্যামবার্গার, ফুচকা, বা পাপড়ি চাট সবেরই একটা মস্ত গুণ হল মাল মশলা রেডি থাকলে বানাতে সময় লাগে খুব কম। লিস্টিকেলের ক্ষেত্রেই ঠিক তাই। এখানে প্রয়োজন নেই প্রবন্ধের যুক্তির কাঠামোর, নেই বিশ্লেষণের চিরুনির অভিযান অথবা ন্যারেটিভের উপর ভর করে ভেসে চলা, শুধু আছে মেশিনগানের র‍্যাটাট্যাট শব্দে ছুটে আসা তথ্যের আগুনমাখা বুলেট। লেখক ভী খুশ, পাঠক ভী খুশ।

ছানা, পোনাঃ গোটা ছয়েক ছবি, ছবি পিছু সাড়ে তিন লাইনের বর্ণনা। ‘কলকাতায় কোথায় কোথায় ভূতের বাস’ এরকম একটা হেডিং তার সঙ্গে ধরুন ন্যাশনাল লাইব্রেরী, হেস্টিংস হাউস ইত্যাদির ফটো। ফটোর তলায় থুতু ছেটানর মত এক দুটি করে বাক্য - এ হল লিস্টিকেলের ছানা। দু-চারটে গ্রাফিকস জুড়ে দিয়ে ভূতেদের গড় বয়স, হাইট, রুজি রুটির খবর যদি দেওয়া যায় তাহলে ছানা থেকে পোনা হল। এই ছানা পোনাদের নাম রাখা হয়েছে চার্টিকেল(চার্ট প্লাস আর্টিকেল)।

ফর্দ-লেখককে প্রাবন্ধিকের মত গান গেয়ে বিদায় নিতে হয় না। তাই উপরের লিস্টিকেলটি হুট করেই শেষ করা গেল। এবার ভেবে দেখার পালা। কোনটাকে বেশি মার্কস দেবেন। শুরুর ওই দমকা বাতাসের মত বলে যাওয়া একরাশ হাবিজাবি কথা নাকি উপরে সাজিয়ে লেখা লিস্টিকেলটি। মনে রাখতে হবে যে এই দুইয়ের মাঝখানে কোথাও নটা পাঁচটা ডিউটি করা নর্ম্যাল প্রবন্ধের স্থান। সিদ্ধান্তে আসার আগে আমাদের সেই বন্ধুর কাছে পাওয়া ‘অদৃশ্য হওয়ার পাঁচটি উপায়’ লেখাটি পড়ে নেওয়া যেতে পারে। কে জানে কখন কাজে লেগে যায়।


Please Sign in or Create a free account to join the discussion

bullet Comments:

 
Debtanu Sanyal (Saturday, Dec 13 2014):
Reading Mr Rajat Chaudhuri or following his writings is surely an EXPERIENCE for readers as he easily roams from one topic to another. Listicle proved that once more. As a reader I have seen it is difficult to get an informative as well as enjoyable piece of writing simultaneously. This one meets all these parameters. Thank U Rajat Da.
 

 

  Popular this month

 

  More from Rajat


PrabashiPost Classifieds



advertisement


advertisement


advertisement